সুপারফুড চিয়া সিড কেন খাবেন জেনে নিন



চিয়া সিড কি? (chia seeds in bengali)

অনেক পুষ্টিসম্পন্ন এক খাদ্য হল চিয়া সিড বা চিয়া বীজ (chia seeds in bengali)। মরুভূমিতে জন্মানো সালভিয়া উদ্ভিদের বীজ হলো এই চিয়া বীজ। সেন্ট্রাল আমেরিকা হল এই বীজের আদি জন্মস্থান আর সেন্ট্রাল আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসীদের খাদ্য হিসেবেও এই বীজ ছিলো খাদ্য তালিকায়। সেন্ট্রাল আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসীদের কাছে সোনার চেয়েও মূল্যবান ছিলো এই বীজ। তারা এই বীজকে নিজেদের সাহস ও শক্তি জোগানোর উৎস মনে করতো।

এই চিয়া বীজ দেখতে তিলের মতো, এরা সাদা ও কালো উভয় রঙের হয়। এই বীজের ভালো একটি গুণ হলো এরা সব ধরনের আবহাওয়ায় হয় এবং এদেরকে পোকামাকড় সহজে আক্রমণ করতে পারে না। অনেকেই একে ব্যাসিল সীড বা তোকমার সাথে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু চিয়া বীজ তোকমার চেয়ে আকারে ছোট।

সিরামিকের পাত্রে চিয়া সিড
চিয়া সিড

উৎপত্তি

চিয়া বীজ মূলত মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকায় জন্মালেও বাংলাদেশেও বর্তমানে এটি জন্মাচ্ছে। বাংলাদেশে গবেষকরা চিয়া বীজ দেশে আনেন। সে থেকেই বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে দেশে এই বীজকে অভিযোজনের মাধ্যম উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়। এরপর তিন বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেশে এর সফল চাষের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। বর্তমানে দেশে এর সফল চাষ হচ্ছে।

যেকোনো ধরনের আবহাওয়ায় হওয়ার উপযোগী এই চিয়া বীজ ৯০ দিনের মধ্যেই ফসল তোলা যায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ফসল লাগানো যায় বা উচিৎ। তাতে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমণ না থাকার কারণে এই ফসল চাষ করে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও লাভবান হওয়া সম্ভব।

কোথায় পাওয়া যায়?

বাংলাদেশেও এই চিয়া বীজ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এত সহজপ্রাপ্য না হলেও দেশের বিভিন্ন বড় বড় দোকান বা সুপারশপে এই চিয়া সীড পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ৩০০-৪০০ টাকা দামে বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় দোকানে এটি পাওয়া যায়।

আবার কোনো কোনো দোকানে ভিন্ন দামেও এটি পাওয়া যায়। কোথাও দাম বেশি আবার কোথাও কম। মূলত ব্যাপক পরিসরে এর চাষাবাদের শুরু না হওয়ায় এটি সব জায়গায় সমান ভাবে পাওয়া যায় না এবং পাওয়া গেলেও দামের তারতম্য থেকেই যায়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন শপেও এই বীজ পাওয়া যায়। অত্যন্ত পুষ্টিকর ও উপকারী চিয়া বীজ চাইলে আপনারা অনলাইন থেকেও কিনতে পারেন। দামের তারতম্য হলেও সঠিক ভাবে বাছাই করে ভালো মানের বীজ কেনাই ভালো। কারণ এই চিয়া বীজের পুষ্টিমান অত্যন্ত উচ্চমানের।

চিয়া সীডের পুষ্টিগুণ

চিয়া বীজ একটি সুপার ফুড। এর মধ্যে রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। দুধে যেই ক্যালসিয়াম আছে তার চেয়ে ৫ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম আছে এই চিয়া বীজে। এছাড়া আরো রয়েছে ভিটামিন সি যার পরিমাণ কমলাতে থাকা ভিটামিন সি এর চেয়ে ৭ গুণ বেশি।

এছাড়া রয়েছে আয়রন। আয়রনের পরিমাণ পালং শাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশি। পটাশিয়াম রয়েছে কলার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণে চিয়া সিডে এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড আছে স্যালমন মাছের চেয়ে ৮ গুণ বেশি পরিমাণে।

চিয়া সিডের উপকারিতা:

সুপারফুড চিয়া বীজের রয়েছে অনেক উপকারিতা। এটি একটি সুপারফুড হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে এর অনেক উপকারিতা। এবার এর উপকারিতা গুলো জেনে নেওয়া যাক।

  • চিয়া বীজ কর্মক্ষমতা ও শক্তি বাড়ায়।
  • এটি দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • চিয়া বীজ দেহের ওজন কমাতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে।
  • এটি ডায়বেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমায়। কারণ এটি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
  • অধিক ক্যালসিয়াম সম্পন্ন হওয়ায় হাড়ের শক্তি বৃদ্ধিতে এটির ভূমিকা রয়েছে।
  • কোলন বা মলাশয় পরিষ্কার রাখে চিয়া বীজ। ফলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
  • প্রদাহজনিত সমস্যা দূর করতে চিয়া সিড উপকারী।
  • যেকোনো ক্যান্সার প্রতিরোধে চিয়া সিডের উপকারিতা রয়েছে।
  • ভালো ঘুমের ক্ষেত্রেও এটি উপকার করে।
  • হজমশক্তি বাড়াতেও এই বীজ কার্যকর।
  • হাঁটুর ব্যথা ও অন্যান্য জয়েন্টের ব্যথা দূর করে এই বীজ।
  • শরীর থেকে বিষাক্ত বা টক্সিন জাতীয় পদার্থ বের করে দিতে এই বীজের ভূমিকা রয়েছে।
  • ত্বক, চুল ও নখ সুন্দর করতেও চিয়া বীজ ভূমিকা রাখে।
  • গৃহপালিত পশুর খাদ্য হিসেবেও এই বীজ ব্যবহার করা যায়।
  • প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে এই বীজ।

ওজন কমাতে চিয়া সিড ওটস ব্রেকফাস্ট রেসিপি

চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম

নারিকেল, আম ও চিয়া সিড পুডিং
নারিকেল, আম ও চিয়া সিড পুডিং

সুপার ফুড চিয়া বীজ বা চিয়া সিড বিভিন্ন উপায়ে খাওয়া যায়। এবার জেনে নিবো কিভাবে এটি খাওয়া যেতে পারে।

  • চিয়া বীজ খাওয়া যেতে পারে শরবত হিসেবে। এটি বেশ জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। আপনি চাইলে টক দই, শসার সাথে চিয়া বীজ মিশিয়ে খেতে পারেন। এছাড়াও ব্লেন্ডারে কলা, খেজুর, বাদাম ইত্যাদির সাথে এই বীজ মিশিয়ে শরবত করে খাওয়া যেতে পারে।
  • সালাদ হিসেবেও চিয়া বীজ খাওয়া যায়। সালাদ হিসাবে অন্য নিয়মিত উপাদানের সাথে এই বীজ যোগ করে খাওয়া যায়।
  • নারিকেলের পানি বা পছন্দ মতো অন্য ফলের রসের সাথে ২ থেকে ৩ চামচ পরিমাণ চিয়া বীজ মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

এছাড়াও ওজন কমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর এই বীজ চাইলে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ও রাতে ঘুমানোর আগে পানি ও ২-৩ চামচ লেবুর রসের সাথে ১-২ চামচ চিয়া সিড খেলে তা ওজন কমাতে ভালো ভূমিকা রাখে।

চিয়া সিডের ক্ষতিকর দিক

  • চিয়া সিড শুকনো হওয়ায় এটি সরাসরি খেলে অনেক সময় গলায় আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই চিয়া বীজ খাওয়ার আগে এটি অন্তত ১০-১৫ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিৎ।
  • এছাড়াও চিয়া বীজ ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর এ ব্যাপারে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। তবে কিছু গবেষণার মতে, চিয়া বীজ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এ ব্যাপারে আরো অনেক গবেষণা চলছে এখনো।
  • তাছাড়াও চিয়া বীজ বেশি খেলে অনেকের এলার্জি জনিত সমস্যা হতে পারে। এ সমস্যা থেকে অনেকে গ্যাস্ট্রিক সমস্যা সহ শরীর ফুলে যাওয়া, বাতের ব্যথা এসকল সমস্যাও দেখা দিতে পারে। (আরও পড়তে পারেনঃ এলার্জি থেকে মুক্তির উপায় )
  • এই বীজ দেহের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তচাপ কমায়। তবে অতিরিক্ত পরিমাণ চিয়া বীজ খাওয়ায় রক্তচাপ বেশি কমে যেতে পারে। এতে মারাত্মক কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার অন্যদিকে দেহের শর্করার মাত্রা বেশি পরিমাণে কমে গেলে যাদের ডায়বেটিস আছে তাদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
  • অনেক সময় বেশি পরিমাণ চিয়া বীজ খাওয়ায় ওজন অতিরিক্ত কমে যেতে পারে। এতে দেহে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তাই ডায়বেটিস থাকুক বা না থাকুক, এই বীজ খাওয়ার সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিৎ। এতে দেহের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং উপকারও বেশি পাওয়া যায়। প্রতিদিন ২ থেকে ৪ চামচের বেশি এই বীজ খাওয়া উচিৎ নয়।

উপসংহার:

চিয়া সিড একটি সুপার ফুড হিসেবে খ্যাত। সুপার ফুড হওয়ার যথেষ্ট কারণও এর মধ্যে রয়েছে। প্রচুর পুষ্টি গুণ সম্পন্ন এই বীজ মানুষের দেহের জন্য খুবই উপকারী। মানুষের দেহের অনেক উপকারেই এই বীজের পুষ্টি উপাদান কাজে লাগে।

তবে এত এত পুষ্টি গুণ সম্পন্ন এই খাবারও অন্য যেকোনো খাবার বা উপাদানের মতোই বেশি পরিমাণে খাওয়া ক্ষতিকর। তাই চিয়া বীজের অনেক উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিৎ। এতেই দেহের জন্য পরিপূর্ণ উপকার পাওয়া সম্ভব।

রেফারেন্সঃ

আরও পড়তে পারেনঃ


16 Replies to “সুপারফুড চিয়া সিড কেন খাবেন জেনে নিন”

  1. অনেক অনেক ধন্যবাদ এই উপকারী পোষ্ট দেওয়ার জন্য।

  2. আমার প্রশ্ন আমি তো হ্যাংলা পাতলা আমি যদি এই চিয়া বীজ খাই তাহলে কি আরো বেশি চিকন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাহলে কি করনীয়

  3. আমি বিস্তারিত পড়ে জা জেনেছি ভালোই মনে হচ্ছে। খেয়ে দেখি।

  4. যাদের ওজন কম তারা কি চিয়া বিজ খেতে পারবে?

  5. আমি অনেক চিকন আমি কি এই চিয়াসিড খেতে পারবো?

  6. গুনাগুন গুলোর তথ্য গুলোর রেফারেন্স জানালে উপক্রিত হবো

  7. আমার স্ত্রীর বয়স ৫৬, কুঁকড়ে হাঁটু মুড়ে ঘুমায়।
    মাঝেমধ্যে কোমরের অসহ্য
    যন্ত্রণায় কুপোকাত হয় !তখন মাথার যন্ত্রণা ও বমি বমি ভাব হয়।প্রেসার আছে(প্রেসারের ওষুধ চলে),হাইপোথাইরোডিজম আছে( Eltroxin 100 ওষুধ খায়)।

    সালফা ড্রাগে(Sulfa Drug) সুপার সেনসিটিভ!

    ফিশার আছে,কোষ্ঠকাঠিন্য আছে,স্পন্ডিলাইটিস আছে!
    আমি নিয়মিত রাত্রে শোবার আগে গরম দুধের সাথে চারটে কিসমিস,দুটো তেজপাতা,দুটো কাঠবাদাম ও দুটো ছোট এলাচ ফুটিয়ে পরে মেথি ও চিয়া বীজ এক চামচ দিয়ে নামিয়ে কুসুম কুসুম গরম থাকতে খাওয়াতে পারি?
    আপনাদের মূল্যবান সদুত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।

    1. খওয়াতে পারেন। আপনার উল্লিখিত সবগুলো উপাদান স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। তবে, যেহেতু উনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, এবং চিকিৎসা চলছে, তাই আপনার উচিত হবে যে ডাক্তারের অধীনে উনার চিকিৎসা চলছে, তার সাথে পরামর্শ করা। কেননা, উনার বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবিধির সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  8. আমার হাড়ের জয়েন্ট গুলো প্রচুর ব্যাথা হওয়ায় কয়দিন আগে একজন অর্থোপেডিক্স ডাক্তার এর কাছে গেলাম উনি পরিক্ষা নিরিক্ষা করে বল্লেন আমার যথেস্ট পরিমান পুস্টির ঘাটতি আছে এখন আমি চিয়া সিড খেতে পারবো কি? কতটুকু পরিমান খাব জানালে উপকৃত হবো।

  9. ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে চিয়া সীড কি পরিমাণ খাওয়ানো উচিত??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.