সাধারন লবণ ও বিট লবণ খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

লবণকে আমরা সকলেই খাবারের স্বাদ বর্ধনকারী হিসেবে জানি তবে মানব দেহের জন্য এটির গুরুত্বও অনেক। হৃদযন্ত্র, যকৃৎ থেকে শুরু করে কিডনি, অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডের মতো শরীরের বিশেষ অঙ্গগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় লবণের ভূমিকা অপরিহার্য। এটি ছাড়া খাবারের কোনো প্রকার স্বাদ পাওয়া যায় না। সত্যিকার অর্থে, এটি খাবারের স্বাদকে বাড়িয়ে তোলে বা স্বাদকে বের করে আনে।

লবণ খাওয়ার উপকারিতা:

খাবার খাওয়ার সাথে সাথে যদি স্বাদ না পাওয়া যায় তাহলে আর খেতে ইচ্ছে করে না। অবশ্য যদি খাবারে লবণের পরিমাণ কম হয় তাহলে আলাদা লবণ ব্যবহার করে খাবারকে সুস্বাদু করে নিতে পারি। আসলে লবণ এমন এক ধরনের খনিজ পদার্থ যা কম খেলেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি বেশি খেলেও তা খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই আমাদের সকলের উচিত পরিমাণমতো এটি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। নীচে লবণ খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো:

ক) আয়োডিনের প্রয়োজন পূরণ করেঃ

আয়োডিন আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আমাদের দেহ নিজে থেকে আয়োডিন উৎপাদন করতে পারে না। এটির অভাবে শারীরিক গঠন বা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এটির অভাবে শরীরে হাইপোথাইরয়েডিজম এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন না, বাংলাদেশে আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন, ২০২১ বলবৎ রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী প্রতি কেজি লবণে ৫০ পিপিএম আয়োডিন মেশানোর নির্দেশনা রয়েছে, যাতে ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১৫ থেকে ২০ পিপিএম আয়োডিন বিদ্যমান থাকে।

খ) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে:

লবণ কিন্তু রক্তে চিনির পরিমাণকে প্রভাবিত করে না। তবে ডায়বেটিক রোগীদের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় পরিমিত পরিমাণে লবণ গ্রহণ করা উচিৎ। এটি আমাদের শরীরের তরলের পরিমাণকে স্বাভাবিক রাখে। ডায়বেটিক রোগীদের প্রয়োজন ভেদে ইনসুলিন নিতে হতে পারে। খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে লবণ ইনসুলিন এর প্রতি সংবেদনশীলতা দুর্বল করতে সক্ষম।

গ) হজমে সহায়তা করে:

একটি ধারণা অনুযায়ী খাবার খাওয়ার আগে সামান্য লবণ জিহ্বায় লাগিয়ে নিলে সেটি খাবার হজমে সহায়তা করে। হজমশক্তি বাড়াতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। এই এসিড ক্লোরিন এবং হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে তৈরি হয়। আর এই দুটি উপাদানই লবণের মধ্যে রয়েছে।

ঘ) ওজন কমায়:

অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া অনেকের কাছেই একটি বড় সমস্যার নাম। প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, লবণ শরীরে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে স্থূলতা বাড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। আপনি আপনার দৈহিক প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু প্রয়োজন এটি সেবন করতে পারেন।

ঙ) সর্দি-কাশি কমাতে উপকারি:

যাদের সাইনাসের সমস্যার জন্য সর্দি হয় তাদের জন্য লবণ উপকারি। এটি সাইনাসের কনজেশন ভাব দূর করতে সক্ষম। শুকনো কাশি হলে মুখে সামান্য লবণ রাখলে ঘন ঘন কাশির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ব্লাড ভেসেল ও সেলগুলোকে লবণ কিছুটা সংকুচিত করে রাখতে পারে ফলে শরীর গরম থাকে।

চ) মুখের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে:

লবণের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে লড়াই করার সক্ষমতা রয়েছে। অনেকেই মাড়ির ব্যথা ও দাঁতের ব্যথায় ভুগে থাকেন যা অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক। নিয়মিত লবণ জলের গার্গল করলে মুখের ব্যাকটেরিয়া দূরে থাকে।

ছ) ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে:

আমাদের রক্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লবণ জাতীয় উপাদান আছে যাদেরকে একত্রে ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে অবহিত করা হয়। লবণে এই সকল ইলেক্ট্রোলাইটের পরিমাণকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখার ক্ষমতা রয়েছে।

জ) লবণ দিয়ে ঘরোয়া চিকিৎসা:

  • পোকামাকড়ের কামানোর স্থানে জ্বালাপোড়া বা ফুলে যেতে পারে। সেই স্থানে সামান্য লবণ প্রয়োগ করলে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • হাতে মাছের কাঁটা লাগলে সেখানে এটিকে ঘষে নিন, এর ফলে বিষ ব্যাথা কমে যাবে। এরপর অল্প পানিতে সামান্য নুন মিশিয়ে হাত ডুবিয়ে রাখুন‌। এতে ব্যাথা কম হবে।
  • দাঁতের হলদে ভাব দূর করতে লবণের সাথে সামান্য লেবুর মিশিয়ে সেটি দিয়ে দাঁত মাজুন, এতে উপকার পাবেন।
  • দাঁত ব্যাথার দ্রুত উপশমে লবণের ব্যবহার বহু প্রচলিত।

লবণের এই সকল উপকারিতা ছাড়াও এটি স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থা, আর্থাইটিস, এবং কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লবণের ক্ষতিকর দিক

অতিরিক্ত লবণ খেলে রক্তচাপের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। লবণের মধ্যে থাকা খনিজ সমূহ বেশি বা কম দুটোই আমাদের শরীরের জন্য অপকারি। সবথেকে ভালো হয় আলাদা ভাবে এটি না খেয়ে রান্নার সময়ই পরিমাণমতো এটি ব্যবহার করা।

ক) বেশি লবণ খেলে কি হয়ঃ

বেশি লবণ দেহের কোষে তরলের ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা তৈরি করে। ফলে বেশি বেশি পানি পিপাসা পায় এবং পানি পানের ইচ্ছে হয়। অতিরিক্ত পানি পান করাও স্বাস্থ্যের জন্য অপকারি।

অতিরিক্ত লবণের ফলে মাঝে মাঝে হাতে-পায়ে পানি জমে। ফলে ফোলাভাব সৃষ্টি হয়। এটি কিডনী ও উচ্চরক্তচাপের রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির বিষয়।

একবার বেশি নুন খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে পরে কম লবণ দেওয়া খাবারগুলো আর স্বাদের মনে হয় না।

উচ্চরক্তচাপের রোগীদের জন্য বেশি লবণ সেবন‌ করা বিষের সমতুল্য। সাদা লবণ উচ্চরক্তচাপ বাড়াতে কাজ করে। এর ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক এমনকি কিডনিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও এর অতিরিক্ত সেবনে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে।

বেশি মাত্রায় লবণের ব্যবহারে হাড়ের ক্যালসিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। এর ফলে হাড় অতিরিক্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। এই ধরনের সমস্যাকে অস্টিওপোরোসিস বলে।

খ) কাঁচা লবণ খেলে কি হয়ঃ

অতিরিক্ত কাঁচা লবণ উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি তৈরি করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদযন্ত্রের আর্টারিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আলাদা বেশি পরিমাণে লবণ খেলে ক্যান্সারের মতো মরনব্যাধী রোগ হতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে নুন খেলে পাকস্থলির ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

ইলোকট্রোলাইটসের মাত্রায় তারতম্যের জন্য অধিক পরিমাণে কাঁচা লবণ খাওয়াও দায়ী। যত বেশি পরিমাণে লবণ আমাদের দেহে প্রবেশ করবে ততো কিডনির কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। এর ফলে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

পাকস্থলির আবরণ ক্ষতিগ্রস্থ করতে অতিরিক্ত লবণ সাহায্য করে। ফলে পাকস্থলি আলসারে আক্রান্ত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি ক্যান্সারে রূপান্তর হতে পারে।

অত্যধিক লবণের ব্যবহারে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি কমে আসতে পারে। একইসঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি মনোসংযোগেও ঘাটতি ঘটে। এইসব অবস্থা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।

বিট লবণ কি?

বিট লবণ বা বিট নুন এক ধরনের খনিজ লবণ, যা হিমালয়ের আশপাশের লবণসমৃদ্ধ মাটির নিচ থেকে পাথর আকারে উত্তোলন করা হয়। এই লবণটি সোডিয়াম ক্লোরাইড ও অল্প সোডিয়াম সালফেট, সোডিয়াম বাইসালফেট, সোডিয়াম সালফাইড, আয়রন সালফাইড এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের অপদ্রব্য দিয়ে তৈরি। এটি আমাদের দেশে মসলা হিসেবে ব্যাপকহারে ব্যবহার হয়ে থাকে। আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বিট লবণকে “শীতল মসলা” বলা হয়।

এই লবণে উপস্থিত সোডিয়াম ক্লোরাইড থেকে এটির নোনতা স্বাদ আসে। এই লবণটি একটু গাঢ় বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। সালফারের মিশ্রণ বিট লবণের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যসূচক গন্ধ প্রদান করে।

বিট লবণ এর উপকারিতা:

বিট লবণকে একই সঙ্গে ‘রক সল্ট’ কিংবা ‘ব্ল্যাক সল্ট’ নামেও ডাকা হয়। সাধারণ নুন অপেক্ষা বিট নুনের স্বাস্থ্য উপকারিতা বেশি। নীচে বিট লবণের উপকারিতা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

ক) অ্যাসিডিটি কমায়:

বিট লবণ অ্যাসিডিটির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এটি পিত্ত উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে। এটি রক্তের অম্লত্বের পরিমাণকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

বিট লবণ এর উপকারিতা

খ) ঘুমের সমস্যা দূর করে:

ইনসোমনিয়া বা ঘুমের সমস্যা দূরীকরণে আমাদের বিট নুন খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। প্রধানত শরীরে মেলাটোনিনের মাত্রার তারতম্য দেখা দিলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। এই লবণটি মেলাটোনিনের মাত্রাকে স্থিতিশীল অবস্থায় করতে সাহায্য করে।

গ) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে:

বিট লবণ উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে সাদা লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাদা লবণের বিপরীতে বিট লবণ খাওয়ার উপদেশ দেন।

ঘ) ত্বকের সুরক্ষা:

বিট লবণকে প্রাকৃতিক স্ক্রাবার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এই পদ্ধতিতে ত্বকের উপরিভাগের ময়লা ও মরা চামড়া দূর হয়। এছাড়াও বন্ধ লোমকূপ খুলে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতেও এটি দারুণ কার্যকরী।

আরও জানতে চাই

ক) বিট লবণ কি ক্ষতিকর?

আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেছেন, কোনো কিছুরই অতি কখনো ভালো না। বিট লবণের শত উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার কুফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। অতিরিক্ত বিট লবণের ব্যবহার ফ্লুরাইড বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

খ) অতিরিক্ত লবণ খেলে নাক ডাকে?

অতিরিক্ত লবণ খেলে নাক ডাকার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর নাম হচ্ছেSleep Apnea”। অতিরিক্ত লবণ আপনার ঘাড়ের টিস্যুতে থাকা তরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে আপনার শ্বাসনালীর ওজন বেড়ে যায়। যখন আপনি ঘুমিয়ে যান তখন এই বর্ধিত ওজন আপনার শ্বাসনালীকে উপরের দিকে ঠেলে দেয় এবং এটিকে সংকীর্ণ বা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে শ্বাস নেওয়ার সময় নাক ডাকার আওয়াজ সৃষ্টি হয়।

গ) সৈন্ধব লবণ কি?

সৈন্ধব লবণকে ইংরেজিতে ‘Sea Salt’ নামে ডাকা হয়। এই ধরনের লবণের দানা বড় বড় হয়। অনেকটাই ছোট ডেলার মতো দেখতে। এর রঙ লালচে হয়ে থাকে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই লবণ। এটি প্রক্রিয়াজত লবণের পূর্বের অবস্থা। এই লবণটি সাধারণ সাদা লবণ অপেক্ষা একটু বেশি কড়া হয়ে থাকে।

পরিশেষে-

লবণ আমাদের শরীরের জন্য উপকারী না অপকারি তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে আমরা কি পরিমাণে এটিকে গ্রহণ করছি তার উপর। আমাদের সকলের উচিত পরিমাণমতো ও পরিমিত পর্যায়ে এটিকে খাওয়া।

তথ্যসূত্র:

আরও পড়তে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.