রসুনের উপকারিতা কি কি ? অপকারিতাও আছে কি?


নিত্যদিনের খাদ্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম উপাদান রসুন। সকলেই জানি যে রসুন উপকারি একটি খাদ্য। সত্যিই কী রসুনের শুধু উপকারিতা রয়েছে? অপকারিতা নেই? রসুনের উপকারিতা কি? বিস্তারিত জানলে আপনিও খাওয়া শুরু করবেন রসুন।

বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও উপকারী উপাদানে ভরপুর রসুন। এ সকল ভিটামিনের মধ্যে থায়ামিন, নিয়াসিন, রিবোফ্লাবিন, ফোলেট, সেলেনিয়াম ইত্যাদি অন্যতম।

এছাড়াও রসুনের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এলিসিন। এটি ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া, এলিসিনের মধ্যে পাওয়া একধরনের যৌগিক পদার্থ রসুনকে সুপারফুডের কার্যকারিতা প্রদান করে।

প্রাচীনকালে বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে রসুনের ব্যবহার ছিলো। রসুন মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে রসুন খাওয়া খুবই উপকারী। আসুন এবার জেনে নিই রসুনের আর কি কি উপকারিতা আছে।

রসুনের উপকারিতা

কাঁচা রসুনের উপকারিতা:

রসুনের আচার কিংবা রান্না করা রসুনের চেয়ে কাঁচা রসুনের উপকারিতা অনেক বেশি। রসুন কাঁচা খেলে এর ভেষজ সকল গুণ পরিপূর্ণভাবে বজায় থাকে। তাই কাঁচা রসুন খাওয়ার উপকারিতা সর্বোত্তম। কাঁচা রসুনের উপকারিতা জেনে নেওয়া যাক:

  • সকালে খালি পেটে কাঁচা রসুন খেলে ঠান্ডা লাগার প্রকোপ কমে।
  • কাঁচা রসুন রক্তে শর্করার পরিমাণ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
  • ভাইরাস ও সংক্রমণজনিত রোগ প্রতিরোধে কাঁচা রসুন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • স্নায়ুবিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে কাঁচা রসুন কার্যকর।
  • যকৃত ও মুত্রাশয়ের কাজ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
  • নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস জাতীয় রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

রসুনের আচারের উপকারিতা:

রসুনের উপকারিতা অনেক হলেও অনেকে কাঁচা রসুন খেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে রসুনের আচার হতে পারে একটি দারুণ সমাধান। রসুনের আচারের রয়েছে দারুণ উপকারিতা। যার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি উপকারিতা হল:

  • উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর।
  • যক্ষ্মা রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, পাশাপাশি হজমশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে।
  • পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখতে সাহায্য করে।
  • স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে রসুনের আচার কার্যকরী। এছাড়াও কোলন ক্যান্সার, গলব্লাডার ক্যান্সারসহ অন্যান্য ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধেও বেশ উপকারী রসুনের আচার।
  • চোখে ছানি পড়া রোধে রসুনের আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • রসুনের আচার দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষতিকর ভাইরাসকে ধ্বংস করতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রসুনের আচার

সিদ্ধ রসুনের উপকারিতা:

কাঁচা রসুনের চেয়ে সিদ্ধ রসুন হালকা হয়। যাদের হজমের সমস্যা, কাঁচা রসুন খেতে পারেন না, তারা সিদ্ধ রসুন খেতে পারেন।

খাদ্য পরিপাকে সিদ্ধ রসুন সাহায্য করে। হজম শক্তি বাড়ায়। এছাড়া বমি বমি ভাব কিংবা এ জাতীয় উপসর্গ দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও সিদ্ধ রসুন শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেয় এবং পেটের প্রদাহ দূর করে পেটকে সুস্থ রাখে।

এছাড়াও আরও যা উপকারে লাগে সিদ্ধ রসুন:

সেক্সে রসুনের উপকারিতা:

রসুনের অনেক উপকারিতার মধ্যে অন্যতম হলো সেক্স বা যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি। মূলত পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়াতে রসুন দারুণ ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে মানুষের ভিন্ন মতামত থাকলেও রসুন এ ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর।

যৌন মিলনের ক্ষেত্রে পুরুষের শক্তির মূল উৎস হলো রক্তের গতি। আর রসুন রক্তের সাবলীল গতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একারনেই বলা হয় যে, রসুন সেক্স বা যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও পুরুষের বীর্য তৈরীতে রসুনের ভূমিকা রয়েছে।

চুলের জন্য রসুনের উপকারিতা আছে কি আদৌ?

রসুনের রস চুলের যত্নে খুবই উপকারী। এ ক্ষেত্রে রসুনের উপকারিতা জেনে আপনি অবাক হবেন। চুলের যত্নে রসুনের উপকারিতা সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা কম।

রসুনের তেলের সাথে কাঁচা রসুনের সিরাম বা রস ব্যবহার করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া ডিমের সাদা অংশের সাথে রসুনের রস ও তেল মিশিয়ে চুলে দিলে তা চুল পড়া প্রতিরোধে দারুণ কাজ করে।

তাছাড়া রসুনের কোয়া শুকিয়েও ব্যবহার করা যায়। রোদে রসুনের কোয়া শুকিয়ে তা গুড়ো করে কন্ডিশনারের সাথে ব্যবহার করলে এটি চুল পড়া প্রতিরোধ করে। এবং রসুনের রস চুলের গোঁড়া শক্ত করে।

আদা ও রসুন একসাথে খেলে কী ঘটে?

 আদা ও রসুন

রসুনের উপকারিতা রয়েছে অনেক। কিন্তু রসুনের সাথে যদি আদাও যুক্ত করা হয়? আদা ও রসুন এবং একসাথে খেলে কি উপকার পাওয়া যাবে? আসুন জেনে নিই আদা ও রসুন একসাথে খাওয়ার উপকারিতাগুলো-

আদার রয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (antimicrobial) ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (anti-inflammatory) বৈশিষ্ট্য। আদার এ দুই বৈশিষ্ট্য ও রসুনের ভাইরাস প্রতিরোধী গুণ একত্রে বেশ কার্যকর। যা ফ্লু জাতীয় রোগ প্রতিরোধে বেশ ভালো। আদা ও রসুন একত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

এছাড়া আদা ও রসুন একত্রে মধুমিশ্রিত করে খেলে বদহজম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এবং হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

আদা ও রসুন উভয়ই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

হাঁপানি প্রতিরোধে আদা ও রসুনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, আদা ও রসুন বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অপকারিতা:

সকল জিনিসের উপকারী দিকের পাশাপাশি থাকে কিছু ক্ষতিকর দিক। তেমনি রসুনের উপকারিতা অনেক, পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু অপকারিতা। এবার সেই বিষয় নিয়েই আলোচনা করা যাক-

  • অতিরিক্ত রসুন খাওয়া যকৃতের ক্ষতি করে। অতিরিক্ত রসুন খেলে রসুনের উপাদান ‘অ্যালিসিন’ যকৃতে বিষক্রিয়া করে ক্ষতি সাধন করে।
  • রসুনের সালফার পেটে গ্যাস সৃষ্টি করে, যা থেকে ডায়রিয়া হতে পারে। তাই খালি পেটে রসুন বেশি খাওয়া ঠিক নয়।
  • যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের গবেষণা অনুসারে, খালি পেটে তাজা রসুন খেলে বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে। এমনকি বমি বমি ভাব কিংবা বমিও হতে পারে।
  • বেশি বেশি রসুন খেলে মুখে বেশ দুর্গন্ধ হতে পারে।
  • রসুন রক্তের ঘনত্ব কমাতে সাহায্য করে। তাই যারা রক্ত পাতলা করতে বিভিন্ন প্রকার ঔষধ সেবন করেন, তাদের অতিরিক্ত রসুন না খাওয়াই ভালো। কারণ, রক্ত বেশি পাতলা হলে সহজেই অতিরিক্ত রক্তপাত হয় যা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
  • গর্ভবতী নারীদের প্রসব বেদনা বাড়িয়ে দেয় রসুন। তাই গর্ভবতী নারীদের রসুন না খাওয়াই ভালো।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রসুন যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি অতিরিক্ত রসুন খেলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে মাথা ঘোরানো সহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
  • বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত রসুন গ্রহণে শরীরে ঘামের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর অতিরিক্ত ঘাম দেহ থেকে লবণ পানি বের করে দেয় যা দেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
  • পুরুষের যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করা রসুন নারীর যৌনাঙ্গের সংবেদনশীল টিস্যুতে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
  • অতিরিক্ত রসুন খেলে চোখের কর্নিয়া ও আইরিশের মাঝে রক্তক্ষরণ হতে পারে,যা ‘হাইফিমা’ নামে পরিচিত। আর এ রোগে মানুষের চোখের দৃষ্টিশক্তিও চলে যেতে পারে।
  • তবে এসব অপকারিতার ভীড়ে রসুনের উপকারিতা বেশি। রসুন মানুষের দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত পরিমাণে রসুন খেলে দেহের নানাবিধ উপকার পাওয়া যায়।

একনজরে দেখে নেওয়া যাক রসুনের উপকারিতা:

  • ‌রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • ‌ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
  • ‌রক্ত চলাচলে সাহায্য করে ও রক্ত পরিষ্কার রাখে।
  • ‌রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।
  • ‌সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে।
  • ‌পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়ায়।
  • ‌হজম শক্তি বাড়ায়।
  • ‌চুল গজাতে ও চুল পড়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • ‌স্নায়ুবিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  • ‌উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ করে
  • ‌যকৃত ও মুত্রাশয়ের কাজ স্বাভাবিক করে।

সুতরাং, সার্বিক বিবেচনায় বলা যায় যে, রসুন একটি উপকারী খাদ্য। কারণ, পরিমিত পরিমাণ রসুন গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। রসুনের গুণাগুণ বিবেচনায় অপকারিতাকে পাশে সরিয়ে রেখেই আজ থেকেই পরিমিত পরিমানে রসুন খাওয়া শুরু করতে পারেব।

তথ্যসূত্রঃ

আরও পড়তে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.