মেথির উপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক

মেথির তিতা স্বাদের জন্য অনেকের কাছেই এটি একটি অপছন্দের জিনিস। তবে এটির পুষ্টি গুণাগুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে জানলে সকলেই অবাক হবেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মেথি খেলে দূষিত পরিবেশ এবং ভেজাল খাবারের রাজ্যেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। এটিকে একাধারে মসলা, খাবার ও পথ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যুগ যুগ ধরে কবিরাজী, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসা ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

মেথি কি?

মেথির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে “Fenugreek”। এটি একটি মৌসুমী জাতীয় গাছ। গ্রামবাংলায় এটির পাতাকে শাক হিসেবেও খাওয়া হয়। “Trigonella foenum-graecum” হচ্ছে এটির বৈজ্ঞানিক নাম।

মেথির পুষ্টিগুণ:

এক টেবিল চামচ মেথিতে (১১.১ গ্রাম) ৩৫ ক্যালোরি  থাকে। এছাড়াও-

মেথির পুষ্টি উপাদানপরিমাণ
প্রোটিন ৩ গ্রাম
ফাইবার ৩ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট ৬ গ্রাম
চর্বি ১ গ্রাম
আয়রন দৈনিক যতটুকু প্রয়োজন তার ২০%
ম্যাগনেসিয়াম দৈনিক যতটুকু প্রয়োজন এর ৫%
ম্যাঙ্গানিজ দৈনিক যতটুকু প্রয়োজন এর ৭%

মেথি খাওয়ার উপকারিতা:

যেহেতু মেথি একটি ভেষজ উপাদান তাই এটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। উপরন্তু এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপাদেয়। এটির ব্যবহার শুধুমাত্র আমাদের রান্নাঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয় বরং আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী ওষুধ তৈরিতেও এটির প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে। নীচে মেথি খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক) চুলে মেথির উপকারিতা:

চুলের গোড়া মজবুত করতে ও চুল পড়া কমাতে এটির জুড়ি মেলা ভার। মেথিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন-সি থাকে। এগুলো চুলকে শক্তিশালী করে আর চুল ঝরে পড়া প্রতিরোধ করে। মেথিতে লিথিসিন (Lithisin) নামক পদার্থ থাকে যা চুল পড়ে যাওয়া আটকায়।

একইসঙ্গে মেথি মাথার খুশকি দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। মেথিতে ভিটামিন-ই থাকে যা আমাদের চুলের জন্য খুব উপকারী। এটিতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি জেলোটিন পাওয়া যায় যা চুলের ঔজ্জ্বল্যতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও এটি চুল কালো রাখতে সাহায্য করে। মেলানিন চুলের কালো রঙ ধরে রাখে। মেথির গুঁড়া মেলানিন উৎপাদনে সহায়তা করে।

খ) ঝকঝকে ত্বকের জন্য মেথি:

মেথি ব্যবহার করে সহজেই ঝকঝকে ও উজ্জ্বল ত্বক ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ত্বকের বলিরেখা তৈরির জন্য দায়ী বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান মেথি দূর করে। এছাড়াও এটি চোখের নীচের কালো দাগ বসতে দেয় না। মেথিতে এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল পদার্থ থাকে, যা ত্বকের গভীর স্তর পর্যন্ত যায়। ফলে দীর্ঘদিন এটি ব্যবহার করলে ব্রণের দাগের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

গ) ডায়াবেটিসে মেথির উপকারিতা:

মেথিতে হজম শক্তি বৃদ্ধি করার এবং শরীরের কার্বোহাইড্রেট আর সুগার শোষণ করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। এটি গ্রহণ করলে শরীরের ইনসুলিন নিঃসরণের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মেথিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং বিভিন্ন রকম উপাদান থাকে যা রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ঘ) যৌনশক্তির মহৌষধ মেথি:

মেথির চা উপকারিতা

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনসিটিটিউটের তথ্য অনুসারে ২০০২ সালে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ আমেরিকান পুরুষ যৌন সমস্যায় ভূগে থাকেন। প্রায় ৪২ শতাংশ এশিয়ান পুরুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। মেথি পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোনের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যৌন সমস্যায় ভূগে থাকেন। এটির রসে ‘সাপোনিস’ বা ‘ডাইওসজেনিন’ নামে এক ধরনের পদার্থ থাকে, যা মানবদেহের হরমোন স্তর বা এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

খালি পেটে মেথি খাওয়ার উপকারিতা:

সকালে খালি পেটে মেথি খাওয়ার অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। সকল বয়সের মানুষের জন্যই এটি অত্যন্ত পুষ্টিদায়ক। নিম্নে এটি খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত দৃষ্টিপাত করা হলো:

ক) ওজন কমায়:

মেথি দেহে ফাইবারের পরিমাণ বজায় রাখে। ফাইবার আমাদের বেশি খিদে লাগতে দেয় না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই খাওয়ার পরিমাণ কমে যায় এবং শরীরের ওজন হ্রাস পায়। পড়ুন – অতিরিক্ত ওজন কমানোর উপায়

খ) ক্যান্সার দূরে রাখে:

মেথিতে থাকা ট্রাইগ্লিসেরাইড ব্রেস্ট ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে একটা সময় পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলে।‌ মেথি রক্তে ভেসে থাকা টক্সিক উপাদানগুলোকে শরীর থেকে বার করে দেয়। ফলে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কমে। রক্তে টক্সিক উপাদানের মাত্রা বাড়তে থাকলে শরীরের ভেতরে ক্যান্সার সেলের জন্ম নেওয়ার শঙ্কা থাকে।

গ) কোলেস্টেরল কমায়:

মেথিতে উপস্থিত স্টেরিওডাল সেপোনিনস নামক উপাদান শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে এটি হার্টের আর্টারি ব্লক করে স্ট্রোক বা হৃদক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে।এছাড়াও মেথিতে গ্লেকটোম্যানান নামে আরেকটি উপকারী উপাদান পাওয়া যায় যা হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

ঘ) বাতের ব্যথা কমায়:

৪০ বছরের উর্ধ্বে প্রায় বেশির ভাগেরই বাতের ব্যথার সমস্যা রয়েছে। তবে মেথি এই তীব্র ব্যথা-বেদনা কমাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

ঙ) বুকের দুধ বাড়ায়:

মেথিতে ডায়োসজেনিন নামক এক ধরনের পদার্থ থাকে যা বুকের দুধের উৎপাদন বাড়ায়। একইভাবে এটিতে ভিটামিন, মিনারেল থাকায় মাতৃদুগ্ধের পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই স্তনপান করানো মায়েদের ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এটি খাওয়া প্রয়োজন।

চ) কিডনির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়:

”Phytotherapy Research”– এর তথ্য অনুযায়ী, ক্যালসিয়াম অক্সালেট এর মতো কিডনির পাথর প্রতিরোধ করতে মেথিই যথেষ্ট। এটি খেলে কিডনির মধ্যে কম ক্যালসিফিকেশন তৈরি হয়। এটি দিয়ে তৈরি চা বা রস পান করলে কিডনি পরিষ্কার থাকে ও মূত্রথলি সুস্থ থাকে।

ছ) শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে:

আমাদের দেহে সোডিয়াম, পটাসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌল থাকে যেগুলোর একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকা প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর মাত্রাও বদলে যেতে পারে। মেথি এগুলোর পরিমাণকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

জ) মাসিকের ব্যথা দূরে রাখে:

পিরিয়ডের বা মাসিকের সময় প্রতিটি মেয়ের জন্যই একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এটির ব্যাথা শুধুমাত্র একজন মেয়েই অনুভব করতে পারে। মাসিকের প্রথম ৩ দিন ১৭০০-২৭০০ মিলিগ্রাম মেথির গুঁড়া ও পরবর্তী দিনগুলোয় ৯০০ মিলিগ্রাম করে দৈনিক ৩ বার মেথির গুড়া খেলে মহিলাদের মাসিকের ব্যাথা উপশম করে।

মেথি খাওয়ার নিয়ম:

সবথেকে বেশি যেভাবে আমরা মেথি খেয়ে থাকি তা হচ্ছে রান্নার মসলা হিসেবে। তবে রান্নায় এটি ব্যবহার করতে হলে অন্তত পক্ষে তিন থেকে চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিৎ। এতে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যায়।

অন্যভাবে, এক গ্লাস গরম পানিতে মেথি ভিজিয়ে রেখে ১০ মিনিট থিতিয়ে দিন। এবার লেবু আর মধু মিশিয়ে তরলটি পান করে নিতে পারেন। এছাড়াও রুটি, পরোটা, রান্নার ঝোল, সালাদ এবং মাছ ভাজাতে ও মেথি পাতা দিয়ে রান্না করে খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে নিতে পারেন। এটি একইসঙ্গে স্বাদ‌ বাড়াবে আবার শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানেরও যোগান দিবে।

মেথির অপকারিতা (ক্ষতিকর দিক):

  • মেথি মুখের ভেতরে তিতা স্বাদের প্রদাহ তৈরি করে। যার ফলে অনেকেরই বমি বমি ভাব হয় আবার অনেকের মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দেয়।
  • এটির ব্যবহারে রক্তে চিনির পরিমাণ হঠাৎ কমে যেতে পারে যা ডায়বেটিস রোগীদের বিপদজ্জনক।
  • এটিতে কৌমারীন থাকে যা দানা রক্তের জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে। তাই যাদের রক্ত পাতলা তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটিকে সেবন করা উচিত।
  • গর্ভবতী মায়েরা বেশিদিন এটি খেলে সময়ের আগেই বাচ্চার জন্ম হতে পারে। এমনকি গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে।

উপসংহার:

এখানে আমরা মেথি খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারলাম। এটিকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করলে আমাদের ক্ষতি থেকে বরং লাভই বেশি হবে। মেথি আমাদের সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

তথ্যসূত্র:

  • https://www.healthline.com/nutrition/fenugreek#side-effects
  • https://onlinelibrary.wiley.com/doi/abs/10.1002/ptr.5972

আরও পড়তে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.