জীবিত অবস্থায় মৃত্যুর স্বাদ পাওয়া মানুষেরা

কেমন হবে মৃত্যুযাত্রা ? মৃত্যুর অভিজ্ঞতাই বা কি? এ নিয়ে সংশয় সর্বজনবিদিত । প্রায় প্রতিটি মানুষই জীবনের কোন এক সময়ে ভেবে থাকেন , কেমন হবে ঠিক মৃত্যুর মুহূর্তটি অথবা এই মহাপ্রয়াণের পথটি কেমন? জীবিত অবস্থায় মৃত্যুর স্বাদ পাওয়া মানুষের অনুভুতিই বা হয় কেমন? সত্যিকার অর্থে এর উত্তর পাওয়া সম্ভবপর হওয়ার কথাও না । কেননা, এই কথা বলাই বাহুল্য যে  মৃত্যুর পর কেউ ফিরে এসে এই অনুভুতি বলতে পারবেন না। কিন্ত, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে কিছু মানুষ ফিরে আসে পৃথিবীতে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আশা এই মানুষগুলোর অনুভুতিকে ও অভিজ্ঞতাকে বলা হয় – নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স (near death experience)  বা  “এন ডি ই” ।

সচরাচর কি অনুভব করেন তারা?

বেশিরভাগ “এন ডি ই” অভিজ্ঞতালব্ধ মানুষ বলেছেন , তাদের অভিজ্ঞতা ছিল একদম বাস্তবের মতই । তারা এ ব্যাপারে একমত যে তাদের অনুভুতি গুলো স্বপ্ন ছিলনা বরং সত্য ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার বা অনুভুতির সাথেই এর মিল বেশি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতীত স্মৃতির চাইতেও বেশি দোদীপ্যমান অভিজ্ঞতা মনে হয়েছে অনেকের কাছে । অনেকেই বলেছেন-

”তারা যেন , নিজ দেহ ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের পড়ে থাকা দেহের দিকে তাকিয়ে আছেন”

অনেকেই আবার নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি পুনরায় ফ্ল্যাশ ব্যাক করছিলেন যেন কোন এক অপার্থিব অনুভুতি এসে গ্রাস করে ফেলেছিল চেতনা। অনেকে দেখেন দেহ ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন এক অন্ধকার টানেল এর দিকে যার শেষ মাথায় রয়েছে আলো । অনেকের আবার মহাজাগতিক এক চাঞ্চল্য তৈরি হয় মনে ।

মৃত্যু আত্মা ডাক্তার

কেও কেও আবার তার নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী , তাদের ধর্মীয়ও মহামানব দের দেখে থাকেন , (যেমন বৌদ্ধ ধর্মের অনেকেই গৌতম বুদ্ধ কে ) । অনেকে আবার পূর্বপুরুষ অথবা খুব কাছের আত্মীয় বা বন্ধুকেও দেখে থাকেন এমন সময়।

সুতরাং একথা বলাই বাহুল্য যে , অনেকেই “এন ডি ই” কে  অতীইন্দ্রয়বাদিতা , আধ্যাত্মিক  এবং সর্বোপরি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের স্বপক্ষে একটি প্রমান হিসেবে দেখে থাকেন । স্বভাবতই বেশীরভাগ ধর্মবিশ্বাসের সাথে এবং মৃত্যু পরবর্তী ধর্মীয় বর্ণনাগুলির সাথে মিলে যায় এসব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে । তথাপি একে কোন একটি বিশেষ ধর্ম এবং এর বৈশিষ্টের সাথে মেলানো যায়না , কারন ব্যাক্তির ধর্মবিশ্বাস  এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ বৈশিষ্ট্য গুলি পরিবর্তিত হয় ।

এন ডি ই এর  বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা আদৌ আছে কি ?

নিয়ার ডেথ এক্সপেরিএন্স নিয়ে  করা গবেষণায়, মূলত হেলুসিনেসনকেই এর কারন হিসেবে দেখা হয় । অপর দিকে  এই  অভিজ্ঞতা হওয়া বেশীর ভাগ রোগী ,তাদের অনুভুতি যে বাস্তব ছিল সে ব্যাপারে একমত । সুতরাং এটি সাধারণ হেলুসিনেসন থেকে কিছুটা  আলাদা কিনা এব্যাপারটিও খতিয়ে  দেখছেন  গবেষকরা ।

এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, পৃথিবীর বেশ কিছু স্থানে ধর্মীয় আচার এর অংশ হিসেবে নেশা জাতীয় ড্রাগ অনেক আগে থেকেই ব্যাবহার হয়ে আসছে । যেটি অনেক ক্ষেত্রেই এন ডি ই এর মত বা তার কাছাকাছি অনুভুতি উদ্রেক করে থাকে ।

সুতরাং কিছু গবেষক এই ধরনের মাদকের ফলাফল গবেষণা করে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করেন । তারা মনে করেন আমাদের মস্তিস্কের রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে সঙ্ঘটিত হেলুসিনেসন এর সাথে মিলিয়ে দেখা গেলে এর একটা বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।

ব্রেন মানুষের মাথা মৃত্যুর সময় কেমন হয়

এন ডি ই গবেষণায় কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে , যেসব সুরাহা করা বেশ দুরূহ , কেননা এন ডি ই , রোগীর রাসায়নিক প্রমান (রেস্পন্স) এর চেয়ে তার অভিজ্ঞতা (এক্সপেরিয়েন্স ) এর প্রাধান্য বেশি , অর্থাৎ , রিয়েল টাইম এক্সপেরিয়েন্স মনিটর করা ছাড়া আর কোন ভালো উপায় নেই ।

কিন্তু একথা মানতেই হবে , মৃত্যু পথ যাত্রী একজন মানুষের সাক্ষাতকার নেয়ার চেয়ে তার জীবন বাচানোই মুখ্য বিষয় । আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে , এই পরীক্ষাটি মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর উপর করার কোন রকম সুযোগও নেই ।

আরও একটি ব্যাপার আছে, এন ডি ই এর ঐ সময়  মস্তিষ্কে কি হচ্ছে সেটা সরাসরি পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব, এক্ষেত্রে প্রযুক্তির চেয়ে বেশী  নির্ভর করতে হচ্ছে , রোগীর স্মৃতি এবং ব্যক্ত কথার ওপর ।

মৃত্যু পথ যাত্রী

সাম্প্রতিক গবেষণা এবং প্রমাণ কি বলে?

গবেষকরা এই সমস্যাগুলি বিবেচনায় রেখেই , একটি উপায় বের করেছেন , যেখানে তারা সমিক্ষালব্ধ কিছু তথ্য ব্যাবহার করার সুযোগ পেয়েছেন । এক্ষেত্রে তারা ব্যাবহার করেছেন  “erowid “ নামে একটি ওপেন সোর্স ওয়েব সাইট এর ডেটা বেজ । যেই ওয়েবসাইটে অযুতাধিক মেডিক্যাল ইউজড ড্রাগসের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া একদম ফার্স্ট হ্যান্ড রোগীর কাছ থেকে সংগ্রহ এবং নথিভুক্ত করা আছে ।

গবেষক দলটি প্রায় ১৬৫ রকম হেলুসিনেটিভ ড্রাগসের প্রায় ১৫০০০ আলামত , বিশেষ করে এন ডি ই এর সাথে মিলে যাওয়া গল্প গুলির সাথে , লিঙ্গূএস্টিক কি ওয়ার্ড এর সাথে ক্রস ম্যাচ করানোর মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছেন । এবং বেশ কিছু হেলুসিনেটিভ ড্রাগসের সাথে এন ডি ই এর অবাক করার মত বিশেষ মিল পেয়েছেন ।

উধাহরন স্বরূপ কিছু ড্রাগস যেমন – এল এস ডি এবং  ডি এম টি ( যেটি দক্ষিন আমেরিকায় সামানটিক রিচুয়ালে ব্যাবহার করা হয়) এর কথা বলতেই হয় । এই দুইটি ড্রাগসের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকটাই , এন ডি ই এর কাছাকাছি ।

কিন্তু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টে বহুল ব্যাবহার হওয়া কিটামিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সাথে এর সব চেয়ে বেশি মিল পাওয়া গেছে ।

এন ডি ই হয়ে যাওয়া বেশীরভাগ মানুষের, মৃত্যু ভীতি কমে যায় অনেকাংশেই । অনেকের মধ্যে ধর্মভাব জেগে উঠে , একই সাথে মৃত্যুকে স্বাভাবিক ভাবে দেখার ক্ষমতা জন্মে,  মৃত্যু  যেখানে তাদের কাছে  আর কোন ভয়ের বিষয় থাকেনা , বরং আরেকটি পরিবর্তন হিসেবেই মেনে নেন তারা। সুতরাং গবেষক দলটি ড্রাগসের মাধ্যমে প্রাপ্ত জীবিত অবস্থায় মৃত্যুর স্বাদ পাওয়াকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে গবেষণা করে চলেছেন ,এর ফলে উপকৃত হবেন, ডিপ্রেসনে ভুগছেন এমন সব রোগী যারা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত । গবেষকদের আশা- এর ফলে তাদের মন থেকে মৃত্যু বিভীষিকা কমে সেখানে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।

তথ্য সুত্র –

আরও পড়তে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.