জেনে নিন শুঁটকি মাছের পুষ্টিগুণ

বাঙালির এক অতি পরিচিত খাবার হল শুঁটকি মাছ। এটি বেশ জনপ্রিয় একটি খাদ্য। মাছকে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়ে একে সংরক্ষণ করা হয়। এর রয়েছে আলাদা একটি নিজস্ব গন্ধ ও স্বাদ। এর গন্ধের কারণে অনেকে যেমন এটি খেতে চান না, তেমনি এর গন্ধের জন্যই আবার অনেকের কাছে এটি জনপ্রিয়।

ভিন্ন স্বাদের দারুণ এই খাবার অনেকে খেতে চান না, আবার অনেকে ভাবেন এটি খেলেও উপকারিতা নেই। আসলে কিন্তু তা নয়। এই খাবারের পুষ্টি ও উপকারিতা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই বললেই চলে। এই খাবারের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। আজ আমরা সেসব নিয়েই আলোচনা করবো।

শুঁটকি মাছের পুষ্টি উপাদান

জনপ্রিয় একটি খাদ্য হলেও শুঁটকি মাছের পুষ্টি সম্পর্কে অনেকে সঠিক ভাবে জানেন না। সঠিক ধারণা নেই বলে অনেকে এটি খেতে চান না বা খেলেও ঠিক জানেন না আসলে কি উপকার পাচ্ছেন এ থেকে। তবে এ বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার।

শুঁটকি মাছে রয়েছে নানা পুষ্টি উপাদান। এতে রয়েছে প্রোটিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদির মতো দেহের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এছাড়াও আরও রয়েছে সেলেনিয়াম, নায়াসিন, ভিটামিন-বি১২, কোলেস্টেরল, স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, ক্যালরি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সকল উপাদান।

এতে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ প্রোটিন থাকে যা দেহের জন্য খুবই উপকারী। এই প্রোটিনে থাকা অ্যামিনো এসিড ডিমে থাকা প্রোটিনের সমতুল্য। এছাড়াও শুঁটকিতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

এতে রয়েছে সোডিয়াম যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্নায়ুকেও নিয়ন্ত্রণ করে এবং মাংসপেশির গঠন ঠিক রাখে। এছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে পটাশিয়াম যা দেহের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখে। দেহের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের জন্য দেহে পানির ভারসাম্য ঠিক থাকা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি এই পটাশিয়াম স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হৃৎপিণ্ডের কাজেও সহায়তা করে।

তাছাড়াও এই খাদ্যে রয়েছে ফসফরাস। ফসফরাস দেহের হাড়ের গঠন, দাঁতের গঠন এমনকি ডিএনএ ও আরএনএ এর গঠন ঠিক রাখতেও সাহায্য করে। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন-বি১২ রক্তের লোহিত রক্তকণিকা গঠনে সাহায্য করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে স্থির রাখে। এছাড়াও এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।

শুঁটকিতে রয়েছে নায়াসিন। এই নায়াসিন দেহে খাবার থেকে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও ত্বক সুস্থ রাখে। এছাড়াও এই খাবারে রয়েছে কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

শুঁটকি মাছের পুষ্টিগুণ

শুঁটকি মাছের উপকারিতা

শুঁটকি মাছের পুষ্টি উপাদান অনেক। এ সকল পুষ্টি উপাদান দেহের জন্য যেমন প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তেমনি উপকারীও। এ সকল উপাদানের রয়েছে অনেক উপকারিতা। আসুন জেনে নিই এই খাবারের উপকারিতা কি কি।

ক) শক্তি জোগায়

যারা অনেক বেশি পরিশ্রম করেন তারা এই মাছ খেতে পারেন। এটি দেহে ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে ও দেহে কাজ করার শক্তি জোগায়।

খ) কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে

দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুঁটকি বেশ কার্যকর। এটি দেহে উপকারী কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি বেশ উচ্চমানের আমিষ, প্রোটিন যুক্ত খাবার হওয়ায় হার্টেরও উপকার হয়। পাশাপাশি প্রচুর কোলেস্টেরল যুক্ত হওয়ায় এটি ওজন কমাতেও বেশ সাহায্য করে।

গ) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এটি বেশ উপকারী একটি খাদ্য। নিয়মিত এটি খেলে যক্ষা, সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, জ্বর ইত্যাদি রোগ সহজে হয় না। পাশাপাশি অন্যান্য রোগের বিরুদ্ধেও এটি প্রতিরোধ গড়তে সাহায্য করে। এছাড়াও এতে আয়োডিন, আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি রক্ত বাড়ানোর পাশাপাশি দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে।

ঘ) গর্ভবতী মায়েদের জন্য

গর্ভবতী মায়েদের দেহের জন্য গর্ভাবস্থায় আয়রন,সোডিয়াম ইত্যাদি উপাদান প্রয়োজনীয়তা। আর শুঁটকি মাছে এ সকল উপাদান আছে। পাশাপাশি অন্যান্য আরও অনেক উপাদানও রয়েছে যা গর্ভবতী মায়ের জন্য দরকারী। তাই গর্ভাবস্থায় মায়েরা এটি খেতে পারেন। উপকার পাবেন।

ঙ) হরমোনের সমস্যায়

অনেকের হরমোন জাতীয় সমস্যা থাকে। হরমোন জাতীয় সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে খেতে পারেন এটি। এটি দেহের হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং হরমোন জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। এছাড়াও বাড়ন্ত শিশুদের দেহের গঠনেও এটি সাহায্য করে। পাশাপাশি কায়িক পরিশ্রমের পর দেহে শক্তি জোগাতেও এর রয়েছে অনেক উপকার।

শুঁটকি মাছের অপকারিতা

শুঁটকি মাছের রয়েছে অনেক পুষ্টি। অনেক পুষ্টি থাকার কারণে এটি আমাদের দেহের বিভিন্ন উপকারও করে থাকে। অর্থাৎ, অনেকে এটিকে অপকারী ভাবলেও এটি আমাদের জন্য বেশ উপকারী। তবে শুধুই যে উপকারী এমন কিন্তু নয়। এরও রয়েছে কিছু অপকারিতা। আসুন জেনে নিই শুঁটকির অপকারিতা গুলো।

  • উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকার কারণে এটি বেশি খেলে দেহে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে দেহের নানা ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই যারা মোটা তারা এই খাবার এড়িয়ে চলা উচিৎ। পাশাপাশি হার্টের সমস্যা থাকলেও এটি এড়িয়ে চলুন।
  • পিত্তথলি বা গলব্লাডারে পাথর হলে, কিডনির সমস্যা থাকলে বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে এই খাবার খাওয়া উচিৎ নয়। এতে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
  • এই খাবারে উচ্চমাত্রার প্রোটিন থাকার কারণে লিভার, কিডনি, পিত্তথলিতে যাদের সমস্যা আছে তারা এই শুঁটকি না খাওয়াই ভালো। এতে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
  • উচ্চ প্রোটিনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে তাদেরও এটি এড়িয়ে চলা উচিৎ। পাশাপাশি যাদের ডায়াবেটিসের সমস্যা ও হৃদরোগের ঝুঁকি আছে তারাও এটি না খাওয়াই ভালো কিংবা খেলেও অল্প পরিমাণে খাওয়া ভালো।
  • শুঁটকি সংরক্ষণ করে প্রক্রিয়াজাত করার সময় অনেক লবণ ব্যবহার করা হয়। আর লবণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি হৃদযন্ত্রেরও সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে এই খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • বাতের ব্যথা থাকলে শুঁটকি না খাওয়া ভালো। এতে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে শুঁটকি সংরক্ষণে ক্ষতিকর বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কীটনাশক দেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই এটি রান্নার আগে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে নিয়ে তারপর রান্না করা ভালো। এতে ক্ষতিকর কীটনাশক ও জীবাণুর কার্যকারিতা কমে যায়।

শুঁটকি খাওয়ার উপায়

শুঁটকি মাছ খাওয়া যায় বিভিন্ন উপায়ে। গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হলো শুঁটকি মাছের ভর্তা। এই ভর্তা পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে ভেজে করা যায় আবার সেদ্ধ করেও করা যায়। এছাড়াও শুঁটকির তরকারিও বেশ মজার। শুঁটকির ভর্তা গরম ভাত কিংবা বিভিন্ন পিঠার সাথে বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার।

উপসংহার

শুঁটকি মাছ খাওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যে অনেক বিভ্রান্ত ধারণা আছে। এটি নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাবে অনেকে এটি খাওয়া নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগেন। তবে এটি খেলে পুষ্টি পাওয়া যায়। তাই কোনো রূপ দ্বিধা ছাড়াই এটি খেতে পারেন। তবে সবার ক্ষেত্রে এটি যে উপকারী হবে এমন কিন্তু নয়। তাই যাদের অপকার হতে পারে তারা এটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন কিংবা খেলেও অল্প পরিমাণে খাবেন।

আরও পড়তে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.